পুঁই শাকের স্বাস্থ্য উপকারিতা
পুঁই শাক আমাদের দেশে একটি জনপ্রিয় সুস্বাদু ও পুষ্টিকর শাক। পুঁই শাকের ইংরেজি (Malabar spinach)। একটি প্রবাদ আছে, মাছের মধ্যে রুই আর শাকের মধ্যে পুঁই। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পুঁই শাকে রয়েছে অনেক পুষ্টিগুণ। বাংলাদেশের আবহাওয়া পুঁই শাকের জন্য খুবই উপযোগী। বাঙালির খাদ্য তালিকায় পুঁই শাকের প্রাধান্য অনেক বেশি।
পুঁই শাকের পরিচিতি
পুঁই শাকের বৈজ্ঞানিক নাম (Basella alba) এটি ভারতীয় উপমহাদেশ, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এবং আফ্রিকার কিছু দেশে চাষ হয়। পুঁই শাকের দুটি জাত আছে, একটি হল লাল আর অন্যটি সবুজ রংঙের হয়ে থাকে। এটি সাধারণত বসতবাড়ির আঙ্গিনার বেড়ায় বা মাচায় বেশি জম্মাতে দেখা যায়। এটি ৮-১০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এটি দ্রূত বর্ধনশীল বহুবর্ষজীবী উষ্ণমণ্ডলীয় একটি গাছ ও সরস লতা জাতীয় শাক।
পুঁই শাক রান্নার ধরণ
আলু দিয়ে পুঁই শাক চচ্চড়ি করে খাওয়া, পুঁই- চিংড়ির ঝোল করে খাওয়া, পুঁই শাক ভাজি, পুঁই শাক যেকোনো ডাল দিয়ে ভুনা ইত্যাদি।
পুষ্টি উপাদান
প্রতি ১০০ গ্রাম পুঁই শাকে রয়েছে
১৯ ক্যালরি, আমিষ ১.৮ গ্রাম, শর্করা ৩.৪ গ্রাম, কোলেস্টেরল ০ গ্রাম, চর্বি ০.৩ গ্রাম।
বিভিন্ন খনিজ উপাদান
পটাশিয়াম ৫১০ মিলিগ্রাম, ম্যাগনেসিয়াম ৬৪ মিলিগ্রাম, সোডিয়াম ২৪ মিলিগ্রাম, ম্যাংগানিজ ০.৭৪ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ১০৯ মিলিগ্রাম, ভিটামিন বি-৬ ০.২৪ মিলিগ্রাম, লৌহ ১.২ মিলিগ্রাম, নিয়াসিন ০.৫ মিলিগ্রাম, ফোলেট ১৪০ মিলিগ্রাম, জিংক ০.৪৩ মিলিগ্রাম ইত্যাদি।
এছাড়াও আরো বিভিন্ন ভিটামিন আছে যেমন: ভিটামিন- সি রিভোফ্লাভিন, থায়ামিন, ভিটামিন এ ইত্যাদি উপাদান।
পড়ুন- মূলা শাকের স্বাস্থ্য উপকারিতা
আরো পড়ুন- লাউ এর উপকারিতা
ডায়াবেটিস (Diabetes) কমায়
পুঁইশাকে আছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এই অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রক্তে শর্করার মাত্রা কমাতে সহায়তা করে এবং ইনসুলিনের ভারসাম্য বজায় রাখতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এটি প্রমাণিত হয়েছে যে ডায়াবেটিস এর ক্ষেত্রে পেরিফেরাল নিউরোপ্যাথি ও অটোনমিক নিউরোপ্যাথি কমায়। এতে বলা যেতে পারে যে পুঁইশাক ডায়াবেটিস কমাতে বেশ উপকারী।
ক্যান্সার (Cancer) প্রতিরোধ
বিভিন্ন শাক সবজির মতো পুঁইশাকেও আছে ক্লোরোফিল। গবেষকদের মতে এই ক্লোরোফিল কিন্তু কার্সিনোজেনিক প্রভাব রোধ করতে অনেক ভালো কাজ করে। এই কার্সিনোজেনিকের প্রভাবেই ক্যান্সার হয়। এই কার্সিনোজেনিক প্রভাব হতে পারে খুব বেশি মাত্রায় কিছু গ্রিল করলে। পুঁই শাক ক্যান্সার দূর করতে বেশ উপকারী একটি উদ্ভিদ। পুঁইশাকে আছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবার বা আঁশ, যা পাকস্থলী ও কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধে বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
রক্তচাপ (Blood pressure) নিয়ন্ত্রণ
পুঁই শাক পটাশিয়ামের ভাল উৎস। এই শাক রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে থাকে। পটাশিয়াম দেহের সোডিয়ামের মাত্রা ঠিক রাখতে পারে। এটি নিয়মিত খেলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে থাকে।
হজম ক্ষমতা বৃদ্ধি
পুঁই শাকে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমানে ফাইবার বা আঁশ, যা বদহজম, গ্যাস, অ্যাসিডিটির সমস্যা দূর করে। আবার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, এবং দেহের বর্জ্য সুষ্ঠুভাবে ত্যাগ করতে সাহায্য করে। যারা বদহজম, গ্যাস, অ্যাসিডিটির সমস্যা ভুগছেন তারা নিয়মিত পুঁই শাক খেতে পারেন। এতে এই সব সমস্যা থেকে মুক্তি পাবেন।
ত্বকের সুরক্ষা
পুঁই শাকে আছে ভিটামিন এ। এই শাক আমাদের ত্বকের আর স্ক্যাল্পের তেল নিঃসরণকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ত্বকে অতিরিক্ত নিঃসরণ হলে ব্রণ হয়। পুঁই শাক ব্রণ হওয়ার হার কমিয়ে দেয়। (Malabar spinach for skin)
হাড় গঠনে
পুঁই শাকে আছে ভিটামিন কে যা হাড় গঠন করতে সাহায্য করে। ভিটামিন কে হাড়ের মেট্রিক্স প্রোটিন ভাল করে। ক্যালসিয়াম ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। তাই হাড়ে শক্তি যোগাতে বা হাড় মজবুত করতে নিয়মিত পুঁই শাক খান।
হৃদরোগ
পুঁই শাকে আছে ভিটামিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ফলিক এসিড, ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড ইত্যাদি পুষ্টিগুণ হৃদপিণ্ডের বেশ উপকারী। এই উপাদানগুলো শরীরের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে ধমনীতে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল জমতে বাধা প্রদান করে। গবেষকেরা পরামর্শ দিয়ে থাকেন নিয়মিত পুঁইশাক খেলে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা কমে যায়।
শুক্রাণুর সক্রিয়তা বৃদ্ধি
নিয়মিত পুই শাক খেলে শুক্রাণুর সক্রিয়তা বেড়ে যায়। সবুজ শাক- সবজিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, জিঙ্ক, ফলিক এসিড এবং আয়রন আছে যা শুক্রাণুকে সুস্থ-সবল রাখতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।
ওজন কমায়
পুঁই শাক ভিটামিন সি এবং আয়রন সমৃদ্ধ মেটাবলিজম বা বিপাক ক্রিয়া সহজ করে ক্যালরি ক্ষয় করতে সহায়তা করে। অতিরিক্ত মোটা হলে নিয়মিত পুঁই শাক খেতে পারেন। এতে ওজন কমানোর উপাদান আছে।
শিশুদের বৃদ্ধিতে
পুঁই শাক শিশুদের নিয়মিত খাওয়াতে পারেন, এতে শিশুদের বৃদ্ধি ভাল হয়। পুঁইশাক থেকে শিশুরা তাদের বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেল পেতে পারে। তাই শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পুঁইশাক খাওয়ানোর অভ্যাস বেশ উপকারী।
পড়ুনঃ আমলকী খাওয়ার স্বাস্থ্য উপকারিতা
পুঁই শাকের অপকারিতা
পুঁইশাকের কিছু অপকারিতাও আছে। যাদের অ্যালার্জির সমস্যা আছে তারা বেশি পরিমাণে পুঁইশাক খেলে এলার্জির মাত্রা বাড়তে পারে। পুঁই শাক অক্সালেটস সমৃদ্ধ। এটি গ্রহণ করলে শরীরের তরল পদার্থে অক্সালেটস এর পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, যার কারণে শরীরে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। পুইশাকে পিউরিন নামক এসিড আছে। যা অতিরিক্ত গ্রহণের ফলে শরীরে ইউরিক এসিড বেড়ে যায় এবং এর ফলে কিডনিতে পাথর, গেঁটেবাত ইত্যাদি রোগ হতে পারে। যাদের কিডনিতে পাথর, শরীরে এলার্জি এবং পিত্তথলির বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন, তাদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত পুঁইশাক গ্রহণ করা উচিত হবে না। (Malabar spinach side effects)



0 comments:
Post a Comment