আমলকী খাওয়ার স্বাস্থ্য উপকারিতা
আমলকী স্বাস্ব্যের জন্য খুবই উপকারি একটি ফল। আমলকীর ইংরেজি নাম (amla) বা Indian gooseberry এবং বৈজ্ঞানিক নাম (Phyllanthus emblica)। সংস্কৃত ভাষায় এর নাম আমলক। এটি এক ধরনের ভেষজ ফল। দেশি ফল হিসেবে আমলকী সবার কাছে পরিচিত। আমলকী টক ও কষযুক্ত একটি ছোট ফল। ছোট হলেও এর গুণের শেষ নেই।
আমলকী (Amalaki) (amla) এমন একটি ফল (fruit) যা সব রোগ তাড়াতে না পারলেও, সব রোগ প্রতিরোধ করতে পারে। আমলকীর পাতা, ফুল, ফল, বীজ, ছাল এবং শিকড় সবগুলোই ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। আমলকীকে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে অমৃত ফল বলা হয়। আমলকী আয়ুর্বেদ ও ইউনানি ঔষধ তৈরিতে খুবই ব্যবহার করা হয়। প্রায় ১০০ প্রকার আয়ুর্বেদ ও ৫০ প্রকার ইউনানি ঔষধ তৈরিতে আমলকী ব্যবহার হয়। আমলকীতে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার সমাধান রয়েছে।
আমলকীর পরিচিতি
: আমলকী গাছে ৮-১৮ মিটার উচ্চতা বিশিষ্ট হতে পারে।
: এর ফল, হালকা সবুজ বা হলুদ রঙের ও গোলাকার। শরৎকালে ফল পাওয়া যায়।
: এর পাতা, ঝরা প্রকৃতির, হালকা সবুজ রঙের, পাতা যৌগিক প্রকৃতির এবং আকারে ছোট, ১/২ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়।
: এর কাঠ, অণুজ্জল লাল বা বাদামি লাল বর্ণের হয়।
: এর বংশবিস্তার, বীজের মাধ্যমে হয়।
আমলকীর ব্যবহার
আমলকীর (Amalaki) ভেষজগুণ রয়েছে প্রচুর। এর পাতা ও ফল দুটিই ওষুধরূপে ব্যবহার করা হয়। আমলকী খেরে মুখের রুচি বাড়ে। স্কার্ভি বা দন্তরোগ সারাতে টাটকা আমলকী ফল অতুলনীয়। এচাড়াও পেটের পীড়া, সর্দি, কাশি ও রক্তশুন্যতা জন্যও বেশ উপকারি।
এটি অনেক উপায়ে ব্যবহার (use) করা হয়। যেমন- আমলকীর রস, আমলকীর গুঁড়া, আমলকীর আচার ইত্যাদি। বিশেষজ্ঞরা বলেন আমলকী খাওয়ার সবথেকে উপযোগী সময় হলো শীতকাল।
তিনটি শুকনো ফল রাতে একত্রে ভিজিয়ে রেখে সকাল বেলা ছেঁকে খালি পেটে শরবত হিসেবে খেলে পেটের অসুক ভাল হয়। আমলকীর রস (juice) খালি পেটে খেতে পাড়ের, তবে রসের পরিমান ১০ মিলিগ্রামের বেশি খাওয়া উচিত নয়। বিভিন্ন ধরণের তেল তৈরিতে আমলকী ব্যবহার হয়। কাঁচা অথবা মুকনো আমলকী বেটে একটু মাখন মিশিয়ে মাথায় (head) লাগালে খুব দ্রূত ঘুম আসে। কাঁচা আমলকীর রস প্রতিদিন চুলে লাগিযে ২-৩ ঘন্টা রাখতে হবে, এভাবে এক মাস মাখলে চুল উঠা, চুলের গোড়া শক্ত, তাড়াতাড়ি চুল (hair) পাকা কমে যাবে।
আমলকীর বিস্তার
বাংলাদেশ (Bangladesh), ভারত, চীন, শ্রীলঙ্কা, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, হংকং, মালয়েশিয়া, লাওস, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আমেরিকায়। বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলেই এই গাছ দেখা যায়।
ওষুধি গুণ
: আমলকী চুল ওঠা বন্ধ করতে বেশ উপকারী।
: চুলের খুসকির সমস্যা দূর করে।
: আমলকী খাওয়ার রুচি বাড়ায়
চোখ উঠলে কাঁচা আমলকীর রস ২ ফোটা করে দিনে দুই বার দিলে বেশ আরাম পাওয়া যায়।
: এটি বহুমূত্র রোগে উপকারি
: বমি বন্ধে কাজ করে
: দীর্ঘমেয়াদি কাশি সর্দি হতে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমলকীর নির্যাস উপকারি।
: এটি হৃদযন্ত্র ও মস্তিষ্কের শক্তিবর্ধক
: আমলকী কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের উপর কাজ করে
: কোষ্ঠকাঠিন্য, বমিভাব, রক্তশুন্যতা, মাথাব্যথা দূর করতে সাহায্য করে।
একটু কষ কষ ও তেঁতো স্বাদের এই ফলটিতে, ভিটামিন সি রয়েছে
: পেয়ারার চেয়ে ৩ গুণ বেশি
: কাগজি লেবুর চেয়ে ১০ গুণ বেশি
: কমলার চেয়ে ১৫-২০ গুণ বেশি
: আপেলের চেয়ে ১২০ গুণ বেশি
: কলার চেয়ে ৬০ গুণ বেশি
: আমের চেয়ে ২৪ গুণ বেশি
পুষ্টিগুণ
আমলকীতে (Amalaki) রয়েছে এলাজিটানিন, এমব্লিকানিন এ, এমব্লিকানিন বি, কেমফেরল, পানিক্যাফোলিন, পলিফেলন, ফ্ল্যাভোনয়েড, এলাজিক এসিড, গ্যালিক এসিড এবং প্রচুর ভিটামিন সি।
প্রতি ১০০ গ্রাম আমলকিতে রয়েছে
ভিটামিন সি- ৬০০ মিলিগ্রাম
ক্যালসিয়াম- ৫০ মিলিগ্রাম
ফসফরাস- ২০ মিলিগ্রাম
লৌহ- ১.২ মিলিগ্রাম
রিবোফ্লাভিন- ০.০১ মিলিগ্রাম
থায়ামিন- ০.০৩ মিলিগ্রাম
ক্যালরি- ৪৪
কার্বোহাইড্রেট- ১০.২ গ্রাম
ফ্যাট- ০.৬ গ্রাম
ফাইবার- ৪.৩ গ্রাম
ক্যারোটিন- ৯ মাইক্রোগ্রাম
ওমেগা ৩ ফ্যাটি এসিড- ৪৬ মিলিগ্রাম
ওমেগা ৬ ফ্যাটি এসিড- ২৭১ মিলিগ্রাম
আমলকীর বিভিন্ন স্বাস্থ্য উপকারিকা
আমলকী এমন একটি ফল, যার রয়েছে অসংখ্য স্বাস্থ্য (health) উপকারিতা। এটি অনেক উপায়ে ব্যবহার করা হয়। যেমন- আমলকীর রস, গুঁড়া, আচার ইত্যাদি। বিশেষজ্ঞদের মতে আমলকী খাওয়ার সবথেকে উপযোগী সময় হচ্ছে শীতকাল। চলুন জেনে নিই আমলকীর কিছু বিশেষ উপকারিতা।
: আমলকীর আচার খাবারের সঙ্গে খেলে হজমে সাহায্য করে। আধা চূর্ণ শুকনো ফল এক গ্লাস পানিতে ভিজিয়ে খেলে হজমের সমস্যা দূর হয়।
: আমলকীর গুঁড়ো (Amalaki powder) এক গ্লাস দুধ বা পানির মধ্যে সামান্য চিনি মিশিয়ে দিনে দু'বার খেতে পারেন। এতে এসিডেটের সমস্যা কম রাখতে সাহায্য করে।
: আমলকীর রসের সঙ্গে মধু মিশিয়ে প্রতিদিন সকালে খেতে পারেন। এতে ত্বকের কালো দাগ দূর হবে ও ত্বকের উজ্জলতা বাড়বে।।
: আমলকী রোগ প্রতিরোধ বাড়ায় এবং মানসিক চাপ কমায়।
: আমলকীর রস প্রতিদিন নিয়মিত খেলে দাঁত শক্ত থাকে এবং নিঃশ্বাসের দূর্গন্ধ দূর হয়।
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি
আমলকীতে রয়েছে অসাধারন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপাদান। এটি ভিটামিন সি তে সমৃদ্ধ। যা শরীরের বিভিন্ন কার্যকারিতাকে সঠিক ভাবে পরিচালনা করতে সাহায্য করে। যার ফরে শরীরে কোনরকম রোগ হওয়া সম্ভবনা কমে যায়। (vitamins)
চুল (Hair) পড়া নিয়ন্ত্রণে আমলকী
আমলকী (Amalaki) চুল উঠা বন্ধ করতে বেশ উপকারী। কিছুটা আমলকী পানিতে সিদ্ধ করুন, এরপর পুরোপুরি সিদ্ধ হয়ে গেলে এগুলি ম্যাশ করুন এবং একটি পাত্রে পেস্ট তৈরি করুন। এটি মাথার ত্বকের পাশাপাশি চুলেও পেস্ট হিসেবে প্রয়োগ করা যায়। প্রতি সপ্তাহে একবার ব্যবহার করতে পারেন। এতে চুল পড়া নিয়ন্ত্রণে আসে। আমলকীর রস চুলে ব্যবহার করুন এবং আধা ঘন্টা পরে ধুয়ে ফেলুন। আমলকী তেল প্রাকৃতিক ভাবে চুলকে চকচকে ও উজ্জ্বল করে তোলে।
এছাড়াও চুলকে খুসকি মুক্ত ও অল্প বয়সে চুল পাকা রোধে কাজ করে। নারকেল তেল (oil), মেথি গুঁড়া ও আমলকী গুঁড়া একসাথে মাশিয়ে পেস্ট করে নিন। এইভাবে সাপ্তাহে ২ দিন চুলের গোড়ায় দিন উপকার পাবেন।
ক্যান্সার (cancer) নিয়ন্ত্রণে
আমলকীতে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ক্যান্সারপ্রতিরোধী গুণ। গবেষণায় বলা যায় এটি ক্যান্সারের কোষ বৃদ্ধিতে বাধা দেয়। আমলকীর জুস প্রতিদিন সকালে খেলে আলসার প্রতিরোধে কাজ করে। এটি শরীরের বিষাক্ত (poisonous) পদার্থ বের করার পাশাপাশি ওজন কমাতে সাহায্য করে।
ডায়াবেটিস (Diabetes) নিয়ন্ত্রণ
আমলকী রক্তে শর্করা ও লিপিডের মাত্রা কমিয়ে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আনতে সাহায্য কর। বৈজ্ঞানিক (scientific) ভাবে প্রমাণিত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী, তারা যদি প্রতিদিন নিয়ম আমলকী খান, তাদের অন্যদের তুলনায় খুব দ্রূত কমে যাবে। এমনকি ডাযাবেটিসের কারনে লিভারের কার্যকারিতায় যেসব সমস্যা দেখা যায়, সেটিও আমলকীর মাধ্যমে নির্মূল করা যায় বরে যানা যায়। তবে ডায়াবেটিস রোগীদের আমলকী খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া ভাল।
হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়
বেশি কোলেস্টেরলের মাত্রা হৃদরোগের ঝুঁকিকে বৃদ্ধি করে দেয়। আমলকী কেলে খারাপ কোলেস্টেরল দূর করে ধমনীর ব্লক খুলে দিতে সাহায্য করে। নিয়মিত আমলকী খেলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে যায়।
হজম শক্তি
ওজন কমাতে আমলকীর সাহায্য নিতে পারেন। এটি শরীরে প্রোটিনের স্তর বৃদ্ধি করে। যা দেহের চর্বি কমায় এবং হজমশক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। পাশাপাশি ওজন কমাতে পারে।
রক্ত (Blood) পরিস্কার
আমলকীতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান শরীর থেকে টক্সিন উপাদান সব বেড় করে দেয়। আমলকী রক্তে হিমোগ্লোবিন (Hemoglobin) বৃদ্ধি করে।
হাড় (Bone) মজবুত
আমলকীতে রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমান ক্যালসিযাম। যা হাড় মজবুতে বেশ কার্যকরি ভূমিকা রাখে।
কোষ্ঠকাঠিন্য
আমলকীতে সলিউবল ফাইবার থাকে। এটি শরীর থেকে টক্সিন উপাদান বেড় করে সেই সাথে হজমে সাহায্য কর। এর রস কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করে। আবার পাইলস রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
গর্ভাবস্তায় (Pregnancy)
আমকীতে থাকে অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান, যা গর্ভাবস্তায় হাত-পায়ের পাতা ফুলে যাওয়া সমস্যা সহজেই দূর করে। এছাড়াও আমলকীতে প্রচুর পরিমানে জলীয় উপাদান থাকায় দেহকে হাইড্রেট রাখতে সাহায্য (help) করে থাকে। তবে গর্ভাবস্তায় চিকিৎসকের পরামর্শে আমলকী খাওয়া উচিত।
দৃষ্টিশক্তি
আমলকীতে থাকা ভিটামিন সি, ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করে চোখের বিভিন্ন সমস্যা বা অন্যান্য সংক্রমণ রোধ করতে পারে। এছাড়াও আমলকী দৃষ্টি শক্তি প্রখর করতে সাহায্য করে। চোখের পেশীগুলোকে মজবুত (strong) করে ও চোখকে আরাম প্রদান করে। যার ফলে চোখের ক্লান্তি দূর হয়। চোখের ছানি পড়া আটকাতেও সাহায্য করে।
আমলকী ওজন কমায়
বিভিন্ন ভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে ভিটামিন সি এবং অন্টিঅক্সিডেন্ট দুটোই যখোন একসাথে মিশে যায়, তখন ওজন কমানোর চেষ্টা কখনোই বৃথা যায না। শরীরের ফ্যাট, কোলেস্টেরল মাত্রা ও অতিরিক্ত খাদ্য (food) গ্রহণ কমানোর জন্য অন্টিঅক্সিডেন্ট খুবই প্রয়োজনীয়। আমলকীতে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি এবং অন্টিঅক্সিডেন্ট থাকায় জন্য অধিকাংশ শারীরিক ক্রিয়াকলাপ ঠিক মত হয়। যা ওজন কমাতে কার্যকরি ভূমিকা রাখে।
সতর্কতা
গবেষণায় (Research) কোন নেতিবাচক প্রভাব নেই, তারপরেও আমলকী ব্যবহার সম্পর্কিত কিছু হালকা, প্রতিকূল প্রতিক্রিয়া রয়েছে।
হাইপারগ্লাইসেমিক মানুষের জন্য পরামর্শ হল যে বীজযুক্ত ফল ব্যবহার এড়াতে, কারন এতে তাদের স্বাস্থ্য অবস্থা খারাপ হতে পারে।
হাইপার অ্যাসিডিটি ট্রিগার করতে পারে, হাইপার অ্যাসিডিটি বা ভিটামিন সি খাবারের সংবেদনশীলতা সম্পর্কে আগে কোন অসুবিধা থেকে থাকে, তবে এই ফলটি খাওয়া উচিত হবে না।
আমলকী খাওয়ার ফলে কিছু মানুষের শরীরে অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, যেমন- পেট ব্যথা, ডাযরিযা, বমিভাব, লবনতা এবং মুখের চারপাশে ফুসকুড়ি, ত্বকের চামড়া এবং মুখ, শ্বাস-প্রশ্বাস, মাথা ঘোরা, মাথা ব্যথা হালকা কিছু সমস্যা হতে পারে। (Amalaki side effects)