কাঁকরোল এর গুণাগুণ ও উপকারিতা
কাঁকরোল (Spiny gourd) অতি পরিচিত একটি সবজি। এটি অন্য সবজির থেকে অনেকটা আলাদা এবং সুন্দর। কাঁকরোলের তরকারি, ভাজা কিংবা ভর্তা সবকিছুই খেতে বেশ দারুন। গ্রীষ্মকালে শরীর ঠান্ডা রাখতে প্রতিদিন কাঁকরোল খাওয়ার পরামর্শ দেন পুষ্টিবিদরা। কারন কাঁকরোলে টমেটোর (Tomato) চেয়ে ৭০ গুন বেশি লাইকোপিন, গাজরের (Carrot) চেয়ে ২০ গুন বেশি বিটা ক্যারোটিন এবং লেবুর (Lemon) চেয়ে ৪০ গুন বেশি ভিটামিন সি থাকে। (Spiny gourd recipe)
ছোট ছোট নরম কাটা দিয়ে প্রকৃতি সুন্দর করে সাজিয়ে তুলেছে এই সবজিটিকে (Vegetable)। মৌসুমের সবজিগুলোর মধ্যে কাঁকরোল অন্যতম। এটি কুমড়া গোত্রীয় সবজি। বাংলাদেশে প্রায় সর্বত্রই এই সবজির চাষ হয়ে থাকে। কাঁকরল দেখতে ছোট সবুজ রঙের কাঁঠালের মত।
পুষ্টি (Nutrition) উপাদান
প্রোটিন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, খনিজ পদার্থ, শর্করা, চর্বি, আয়রন, ক্যারোটিন, ফাইবার, মিনারেল, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ভিটামিন বি এবং ভিটামিন এ।
ডায়াবেটিস (Diabetics) নিয়ন্ত্রণে
কাঁকরোলের হাইপোগ্লাইসেমিক গুণাগুণ রয়েছে। এটি কম ক্যালরি ও ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার, তাই এটি রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। এটি অগ্নাশয়ের বিটাসেলকে শুরক্ষিত রাখে এবং পূর্ণগঠনে সাহায্য করে।
এছাড়াও এটি ইন্সুলিন নিঃসরণ এবং সংবেদনশীলতা বাড়ায়, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। আরো জেনে নিন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাঁকরোলের ভাজি, কচি কাঁকরোলের জুস করে নিয়মিত খেতে পারেন।
ক্যান্সার (Cancer) প্রতিরোধ
তাজা কাঁকরোলে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি থাক, যা প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এটি দেহের ফ্রি র্যাডিকেলের সংখ্যা কমাতে সাহায্য করে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধেও সাহায্য করে। দেহে ফ্রি র্যাডিকেল সংখ্যা বেড়ে যাওয়া ক্যান্সারের প্রধান কারন। কাঁকরোলে নির্দিষ্ট একটি প্রোটিন (Protein) থাকে, যা ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধিকে প্রতিহত করে।
দৃষ্টিশক্তির উন্নতি
সবুজ এই কাঁকরোলে রয়েছে চোখের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি ভিটামিন, বিটাক্যারোটিন এবং অন্যান্য উপাদান, যা দৃষ্টিশক্তির উন্নতিতে অত্যন্ত কার্যকরী। দৃষ্টিশক্তির উন্নতির পাশাপাশি চোখের ছানি পড়া আটকাতেও বেশ উপকারি।
তারুণ্য (Youthfulness) ধরে রাখে কাঁকরোল
কোষের কাজকে উদ্দীপিত করে এবং স্ট্রেস কমানোর মাধ্যমে ত্বকের বয়স বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে ধীর করতে সাহায্য করে। কারন এতে থাকে বিভিন্ন ধরনের ফ্লাভনয়েড। যেমন- বিটা ক্যারোটিন, লুটেইন, আলফা ক্যারোটিন, জিয়াজেন্থিন ওকোলাজেন থাকে যা অ্যান্টি অ্যাজিং উপাদান হিসেবে কাজ করে, ত্বকে বয়সের ছাপ পরতেও বাধা দেয়। কাঁকরোলের জুস (Juice) বয়সের ছাপ দূর করতে বেশ কার্যকরি।
পড়ুন- মূলা শাকের স্বাস্থ্য উপকারিতা
আরো পড়ুন- ঢেুড়স এর উপকারিতা
গর্ভাবস্তায় (Pregnancy)
গর্ভাবস্তায় মহিলাদেরকে তাদের স্বাস্থ্যের বিষেশ যত্ন নিতে হয়। কাঁকরোল গর্ভবতি মহিলাদের পক্ষে ভাল বলে বিবেচিত হয়। গর্ভাবস্তায় অনেক মাযের স্নায়ুবিক ত্রুটি দেখা দেয়। এ সময় কোষের গঠন ও নতুন কোষ তৈরিতে কাঁকরোল সাহায্য করে। এর ভিটামিন সি ও ভিটামিন বি স্নায়ুবিক ত্রুটি হতে বাধা দেয়
কিডনির পাথর নির্মূল
কাঁকরোল কিডনির পাথর নির্মূলেও খুবই উপকারি একটি সবজি। ১ গ্লাস পানি অথবা ১ গ্লাস দুধে ১০ গ্রাম কাঁকরোল বাটা মিশিয়ে নিয়মিত খেলে কিডনি ও ব্লাডারের পাথর দূর হয়ে যায়। (Spiny gourd of kidney patients)
শ্বাসকষ্ট
শ্বাসকষ্ট হলে ২৫০-৫০০ মিলিগ্রাম কাঁকরোলের শেকড় বাটার সঙ্গে এক চা চামচ আদার রস ও এক টেবিল চামচ মধু (Honey) মিশিয়ে খান, এতে অনেক আরাম পাবেন।
মেদ কমায়
কাঁকরোলে কমলার চেয়ে ৪০ ভাগ বেশি ভিটামিন সি রয়েছে। ভিটামিন সি শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমাতে সাহায্য করে। আর রক্তে ভিটামিন সি এর পরিমান অল্প থাকলে ফ্যাট বার্নিং কম হয়। ফলে ওজন কমে না। যাদের শরীরে প্রয়োজন মত ভিটামবন সি আছে, তাদের ফ্যাট বার্নিং হয় শতকরা ২৫ ভাগ। ফলে তাদের মোটা হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটা কমে যায়।
হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে
হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনাকে কমিয়ে দিতে পারে কাঁকরোল। গবেষনায় জানা গেছে, যাদের শরীরে লাইকোপিনের মাত্রা বেশি তাদের থেকে যাদের শরীরে এর মাত্রা কম থাকে, তাদের ৫০ শতাংশ বেশি হার্ট অ্যাটাকের মম্ভাবনা থাকে। খুব সহজেই এই সমস্যা দূর করতে পারে কাঁকরোল (Spiny gourd)। এটি শরীরের লাইকোপিনের মাত্রা ঠিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কোলেস্টেরল (Cholesterol)
যাদের কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি তারা নিশ্চিন্তে কাঁকরোল খেতে পারেন। এটি উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।
কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ প্রতিরোধ
কাঁকরোলে উচ্চমাত্রার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, তাই এটি কার্ডিওভাস্কুলার রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। সক্রিয় জীবন যাপনের পাশাপাশি কাঁকরোল খাওয়া হৃদস্বাস্থ্যের জন্য বেশ উপকারি।
ফ্যাটি লিভার রোগ নিয়ন্ত্রণে
বর্তমানে অনেকেই ফ্যাটি লিভার রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কাঁকরোলে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ফ্ল্যাভনয়েড থাকে। যা দেহের ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ফ্রি র্যাডিকেল দূর করতে সাহায্য করে।
এছাড়াও এর রয়েছে অ্যান্টিলিপিড প্যারোক্সিডেটিভ গুণাগুণ। যার কারণে ফ্যাটের অক্সিডেশন প্রতিরোধ হয়। নিয়মিত কাঁকরোল খেলে ফ্যাট লিভার (Lever) রোগের ক্ষেত্রে উপকার পাওয়া সম্ভব।
সতর্কতা
কাুঁকরোল (Spiny gourd) সকল শাক-সবজির থেকে আলাদা, এটি সঠিক ভাবে খেলে স্বাস্থ্যের জন্য অনেক উপকারি। আর নিয়ম ছাড়া বার বার- প্রতিদিন খেলে কিছু কিছু অসুবিধাও দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
যেমন- গর্ভবতী এবং স্থন্যদানকারী মহিলাদের কাঁকরোল খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।
কাঁকরোল রক্তে (Blood) শর্করার মাত্রা বেশি কমিয়ে দেয়। যারা ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত তারা অল্প করে খাবেন অতিরিক্ত নয়। প্রয়োজনে নিকটতম চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে খেতে পারেন।
অতারিক্ত পরিমাণে কাঁকরোল খাওয়ার ফলে পেটে ব্যাথা, খাবার হজম না হওয়া, ডায়রিয়া ইত্যাদি সমস্যার সম্ভবনা থাকে।

0 comments:
Post a Comment